ঢাকা সৈয়দ আলীনূর ইসলাম, সৈয়দ মাসুদুর রহমান, সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক এবং মো. হাসিবুল হক মামুন ওরফে ‘ডায়মন্ড মামুনের’ বিরুদ্ধে বিভিন্ন কোম্পানি, আবাসন ও হোটেল-রিসোর্ট প্রকল্পের আড়ালে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ, সম্পদ গোপন, অর্থপাচারসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে দেশের বাইরে সম্পদ গড়ে তোলা এবং একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মালিকানা ও পরিচালনার বিষয়ও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম, কোম্পানির মালিকানা, শেয়ার লেনদেন, দেশ-বিদেশে সম্পদের অবস্থান এবং আয়কর নথিতে ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে প্রকৃত সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত করা প্রয়োজন। তবে এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ফোন করে পাওয়া যায়নি। একাধিক কোম্পানি ও প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, সৈয়দ আলীনূর ইসলাম ‘গোল্ডেনআই ডেভেলপার লিমিটেড’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ একাধিক কোম্পানির পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার হিসেবে যুক্ত রয়েছেন। পাশাপাশি কয়েকটি অংশীদারি ফার্ম এবং একক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ‘পুষ্প হোমস লিমিটেড’ নাম ব্যবহার করে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের কাছে শেয়ার বা আবাসন প্রকল্পে বিনিয়োগের কথা বলে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। অভিযোগে অর্থের পরিমাণ ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা পর্যন্ত দাবি করা হলেও এ অর্থের পরিমাণের স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।
একইভাবে ‘বে-আইকন ইন্টারন্যাশনাল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস লিমিটেড’ নামের প্রকল্পের ব্যানার ও সাইনবোর্ড ব্যবহার করে হোটেল ও রিসোর্ট প্রকল্পের নামে শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে বিপুল অর্থ সংগ্রহ এবং তা বিদেশে পাচারের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে কোম্পানির নথি, ব্যাংক লেনদেন, শেয়ার বিক্রির হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি অনুমোদন যাচাই প্রয়োজন।
ইতোমধ্যে ঢাকা ওয়েস্টার্ন ভ্যালী নিয়ে রাজউকের অভিযান
সৈয়দ আলীনূর ইসলামের সঙ্গে ‘গোল্ডেনআই ডেভেলপারস লিমিটেড’ এবং ‘ঢাকা ওয়েস্টার্ন ভ্যালী’ প্রকল্পের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।
তবে একটি বিষয় ইতোমধ্যে সরকারি অভিযান ও সংবাদ প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রকাশ্যে এসেছে। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সাভারের বনগাঁও ইউনিয়নের বনগ্রাম এলাকায় ‘ঢাকা ওয়েস্টার্ন ভ্যালী’ প্রকল্পে অভিযান চালায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। রাজউকের নগর পরিকল্পনা শাখার তত্ত্বাবধানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সবুজ হাসানের নেতৃত্বে ওই অভিযান পরিচালিত হয়।
রাজউকের ভাষ্য অনুযায়ী, ড্যাপে কৃষিজমি ও জলাশয় হিসেবে চিহ্নিত জায়গা ভরাট করে অনুমোদন ছাড়াই আবাসন প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে অভিযানটি চালানো হয়। অভিযানে প্রকল্পের একটি দোতলা সাইট অফিস উচ্ছেদ করা হয়। একই সঙ্গে একটি বিদ্যুৎ মিটার জব্দ এবং বিভিন্ন সাইনবোর্ড ও ড্রেজার পাইপ অপসারণ করা হয়। সাধারণ মানুষের কাছে জমি বিক্রির নামে প্রতারণার অভিযোগের কথাও রাজউকের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
রাজউকের এই অভিযানকে কেন্দ্র করে প্রকল্পটির অনুমোদন, ভূমির শ্রেণি, জমি উন্নয়ন, প্লট বিক্রির বৈধতা এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সরকারি অনুমোদন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
‘ডায়মন্ড মামুন’কে ঘিরে অভিযোগ
অভিযোগে মো. হাসিবুল হক মামুন ওরফে ‘ডায়মন্ড মামুনের’ নামও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি ডেসটিনি-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের সময় ‘ডায়মন্ড মামুন’ নামে পরিচিতি লাভ করেন এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হন।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। ‘বিটিএম (বিজনেস টেকনোলজি মার্কেটিং লিমিটেড)’সহ কয়েকটি কোম্পানি, অংশীদারি ফার্ম এবং একক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ‘পুষ্পধারা হোমস লিমিটেড’ এবং বে-আইকন ইন্টারন্যাশনাল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস লিমিটেড’-এর নাম ব্যবহার করে জমি, ফ্ল্যাট ও হোটেল-রিসোর্ট প্রকল্পের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় তার নামে বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে একাধিক জমি ও ফ্ল্যাট রয়েছে এবং এসব সম্পদের মোট মূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। একই সঙ্গে আয়কর নথিতে এসব সম্পদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেওয়া হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার একটি এফডিআরসহ আরও ব্যাংক আমানত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে ব্যাংকিং ও আয়কর নথি পর্যালোচনা প্রয়োজন।
বিদেশে সম্পদ ও অর্থপাচারের অভিযোগ
সৈয়দ আলীনূর ইসলাম এবং মো. হাসিবুল হক মামুনের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, সৌদি আরব ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশে সম্পদ গড়ে তোলা এবং অবৈধভাবে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণ করেন এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের আড়ালে অর্থ বিদেশে স্থানান্তর করা হয়ে থাকতে পারে।
তবে বিদেশে সম্পদ থাকা বা বিদেশ ভ্রমণ করাই অর্থপাচারের প্রমাণ নয়। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR), বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নথি ও আর্থিক তথ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও তদন্তের দাবি
অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বিরুদ্ধে অতীতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দলটির অর্থদাতা হিসেবে পরিচিত থাকার দাবি করা হয়েছে। বর্তমানে দেশকে অস্থিতিশীল করার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও করা হয়েছে।
তবে এসব রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও অর্থায়নের অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এই প্রতিবেদনের হাতে নেই। ফলে বিষয়টি নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত দাবি হিসেবে উপস্থাপন না করে সংশ্লিষ্ট সংস্থার তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
তদন্তের দাবি
অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, শেয়ার মালিকানা, ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন, এফডিআর, দেশে ও বিদেশে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, বিদেশে অর্থ স্থানান্তর এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থের ব্যবহার খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।
বিশেষ করে ‘পুষ্পধারা হোমস’, ‘বে-আইকন ইন্টারন্যাশনাল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস’, ‘গোল্ডেনআই ডেভেলোপারস’ এবং ‘ঢাকা ওয়েস্টার্ন ভ্যালী’ সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন ও অনুমোদনের নথি যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে দুদক, বিএফআইইউ, এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক, রাজউক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সমন্বিত তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযুক্তদের বক্তব্য:
এই প্রতিবেদনের প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে হয়েছে। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে পরবর্তী নিউজে প্রকাশ করা হবে।
একাধিক আবাসিক প্রকল্প ঘিরে অর্থপাচার-প্রতারণার অভিযোগ, তদন্তের দাবি।

